সাংবাদিকতার  হালচাল
১৮ জুলাই ২০২৪। শহীদ মীর মুগ্ধ একটা ফেসবুকে স্ট্যাটাস পোস্ট করেছিলেন, ‘একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, আপনি আমিই এখন মিডিয়া। দেশে আর কোনও মিডিয়া নাই। যারা ছিল তারা নিজেদের বেইচ্চা দিছে।’ এই স্ট্যাটাস লেখার কয়েক ঘন্টা পরে উত্তরায় পুলিশের গুলিতে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ শহীদ হন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে দেশের গণমাধ্যমগুলো আওয়ামী প্রোপাগান্ডা প্রচারেই ব্যস্ত ছিল। ২৪ জুলাই দেশের মানুষ যখন ক্ষোভে, শোকে উত্তাল, তখন শেখ হাসিনার সাথে এক মতবিনিময় সভায় নেতৃস্থানীয় অনেক সাংবাদিক আওয়ামী লীগের শাসনে আস্থা প্রকাশ করে এবং আন্দোলনকারীদের ‘দুষ্কৃতকারী’ খেতাব দিয়ে শক্ত হাতে দমন করার কথা বলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে আওয়ামী মন্ত্রী-সাংসদ, অর্থনৈতিকভাবে প্রতাপশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশে মিডিয়া সেক্টরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মিডিয়াকে কব্জা করে ফেলে। কখনও বিরোধী দলের নেতা কিংবা বিরুদ্ধ মতের অধিকারীকে টকশো- তে হেনস্থা করে জনপরিসরে হামলা-মামলা-গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে ফেলার অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে, আবার কখনও সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে জনরোষকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার — অর্থাৎ, মিডিয়া জনগণের মনোযোগ সরানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। মিডিয়া হয়ে উঠেছিল শাসনের অনুষঙ্গ।

এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের চোখে সাংবাদিক হয়ে ওঠে ‘সাংঘাতিক’, গড়পরতায় জনগণ মিডিয়ার উপর আস্থা হারায় যে অনাস্থার প্রতিফলনই দেখি আমরা শহীদ মীর মুগ্ধের ফেসবুক পোস্টে। শুধু মীর মুগ্ধ না, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় অনেক জায়গাতেই আন্দোলনকারীরা সাংবাদিকদের ছবি তুলতে, বা সংবাদ সংগ্রহে বাধা প্রদান করেছে। তবে এই নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া বাস্তবতাতেও অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে এবং অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, কীভাবে জুম্মাতুল বিদা, শামীমা সুলতানা লাবু, নাদিয়া শারমিন —পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল, গুলি, ছাত্রলীগের হামলা উপেক্ষা করে ও আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সারাদেশে ছয়জন সাংবাদিক — মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন পারভেজ, তাহির জামান প্রিয়, আবু তাহের মো. তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক ও সোহেল আখঞ্জী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক সাংবাদিক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত সাংবাদিকগণ তাদের সাহসিকতার মাধ্যমে বাংলাদেশে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধারার মৃত্যুকে প্রতিহত করেছেন। তাদের সাহস ও সত্যনিষ্ঠার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা ও রাজনীতি প্রসঙ্গে এই এককালীন প্রকাশনাটির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। কমিশনটি সারা দেশে সাংবাদিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে একটা প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রদান করেন। তারা মিডিয়া  সেক্টরে একচেটিয়া ক্ষমতা, শাসকের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাকে প্রতিরোধের নানা প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনগত পদক্ষেপের প্রস্তাবনা করেন। কিন্তু প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা ছাড়া সরকার গণমাধ্যম সংস্কার প্রশ্নে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। একদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচ্যসূচি থেকে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাদ পড়ে। অন্যদিকে, প্রায় প্রকাশ্যেই চলল প্রিন্ট, ব্রডকাস্ট মিডিয়াতে মালিকানার দখল- বেদখল-পাল্টা দখলের প্রক্রিয়া। দেশজুড়ে সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাবগুলোতে একই দলীয়করণের চিত্র দেখা যায়।

সাইবার সিকিউরিটি আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো বাতিল করা হয়, কিন্তু তার পরিবর্তে মিথ্যা খুনের ও সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের হয়রানির নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ট্যাগিংয়ের রাজনীতির অবসানের বদলে নতুন ট্যাগ ও নতুন হয়রানির বাস্তবতা তৈরি হয়। পতিত সরকারের আজ্ঞাবাহী-সুবিধাভোগী প্রভাবশালী সাংবাদিকেরা জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় কিছু প্রশ্ন সামনে আসে: ফ্যাসিবাদী সরকারকে বৈধতাদানকারী সাংবাদিকতাকে কী আইনগতভাবে বিচারের আওতায় আনা যায়? মতাদর্শিক অপরাধের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার আইনগত কাঠামো বা প্রক্রিয়া কী হবে? এই জরুরী প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেই ঢালাওভাবে হত্যা মামলা, গ্রেপ্তার, ও হয়রানি অব্যাহত থাকে।  

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিসমূহের উত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক নিউজ পোর্টালগুলোকে মতাদর্শিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। খবর উৎপাদন ও তথ্য প্রবাহের ময়দান সবসময়ই মতাদর্শিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র, কিন্তু ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনসহ নানাবিধ হামলা-মামলা-গুমের ভয় দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল — একটি রাজনৈতিক রূপান্তরকালীন সময়কালে ‘সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক সাংবাদিকতা’ লাগামহীন রূপ লাভ করে, যার চুড়ান্ত প্রতিফলন আমরা দেখি দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো-তে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার, সংবাদের মাধ্যমে চরিত্রহনন, নারীবিদ্বেষী কনটেন্ট ছড়ানো, মব তৈরি করে খবর বানানো বা খবর হয়ে ওঠার ঘটনা, আরও কিছু জরুরী প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: কনটেন্ট নির্মাতা মাত্রই কী সাংবাদিক? ‘ক্ষতিকর সাংবাদিকতা’র ভিকটিম প্রতিকারের জন্য কোথায় যাবেন?

তবে বাংলাদেশে মিডিয়া সেক্টরে কিছু কাঠামোগত দিক আছে যা রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারেও অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে — যেমন সাংবাদিকের লঙ্ঘিত শ্রম অধিকার, মিডিয়া হাউজগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠনে অনাগ্রহ, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাংবাদিকতার উপর সামরিক- বেসামরিক নজরদারি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণমাধ্যম সংস্কারের প্রশ্নটিকে উত্থাপন করলেও দ্রুত ফাইল বন্দী করে। এখন নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। গণমাধ্যম সংস্কার প্রশ্নকে আবারও জনপরিসরে উত্থাপন করার লক্ষ্যেই আমাদের এই প্রকাশনা।
 
2026 ©Drik, Design & Developed by Decode Lab