মুক্ত আলোচনা: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের গুরুত্ব

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের গুরুত্ব
আলোচনায় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, সম্পাদক, সাংবাদিক, বিশ্লেষক, শিক্ষক, গবেষক ও লেখক

দেশের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল, যা এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে এই সুপারিশগুলোকে টেকসই সংস্কারে রূপ দেওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের গুরুত্ব  শিরোনামে আজ রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে একটি মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সঞ্চালনা করেছেন দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম।

আলোচনায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘আমাদের সাংবাদিক সংগঠন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। যেটা আমরা অত্যন্ত নির্ল্লজ্জভাবে করে ফেলেছি। আমরা দেখেছি বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন), ডিইউজে (ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন) নেতারা প্রেস ক্লাবে বাঘ-সিংহের মতো চলাফেরা করতো আর বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা বেড়ালের মতো। এখন রাতারাতি উল্টে গেছে! বাঘ হয়েছে বেড়াল, আর বেড়াল হয়েছে বাঘ। ধরুন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, উনি বলছেন আমরা দলীয় সাংবাদিক চাই না। উনি যখন এই কথা বলেন, ওনার আশেপাশে যারা থাকেন সবাই কিন্তু দলীয় সাংবাদিক।’


খুলনা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী জানান, অন্যায়ভাবে কালের কন্ঠ পত্রিকা থেকে চাকরীচ্যুত হয়েছেন তিনি। আঞ্চলিক সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কথা বলতে পারি না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ধারণ করেন মালিকপক্ষ। তারা না চাইলে গণমাধ্যম কখনও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে না।’
দুই একটা মিডিয়া বাদে কোনও মিডিয়াতে সম্পাদকীয় নীতিমালা নেই বলে জানান নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনও সরকার এনে দিবে না, নিজেদের স্বাধীনতা স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে নিজেদেরই আদায় করে নিতে হবে বলেও জানান তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আল মামুন বলেন, ‘একটা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা কী রকম হবে তার সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত ৩০ বছরে দেশে কোনও মিডিয়া কমিশন হয় নাই। এবং ৩০ বছর ধরেই দেশের মিডিয়া বদলে যাচ্ছে, এখনও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখনও যদি আমরা উদ্যোগ না নেই, তাহলে আমরা যে ভাবি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে, সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে কাজ করবে, তার কোনও কিছুই আর সম্ভব হবে না।’

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কাজের বেলায় কেউ নেই। গণমাধ্যমকে কীভাবে আরও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, নির্বাচিত সরকার সেই একই চেষ্টা করছে।’

সাইবার সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে অ্যাটকো মহাসচিব ও একুশে টিভির চেয়ারম্যান ও সিইও আব্দুস সালাম বলেন, এই আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে, কিন্তু সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। সাংবাদিকদের প্রতি নিপীড়নমূলক আইন মেনে নেওয়া হবে না। একইসঙ্গে টেলিভিশন মিডিয়া নিয়ে বলেন, আগে টিভি চ্যানেল যেই কোম্পানি থেকে বিজ্ঞাপন আনত, তারাই এখন টিভি চ্যানেলের মালিক। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপসহ আরও অনেক। ফলে, তাদের বিজ্ঞাপনের আশিভাগ তো তাদের টিভিতেই যায়। ফলে অন্যান্য দেশের মতো ডিজিটালাইজেশন ও পে-চ্যানেল হতে হবে। 

নেত্র নিউজের আদিবাসী সাংবাদিক ডেনিম চাকমা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সত্য ও সঠিক খবর প্রথম সারির গণমাধ্যমে আসে না। দেশের গণমাধ্যম যেখানে ‘আদিবাসী’ না লিখে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ লেখা হবে কি না এনিয়ে ব্যস্ত তখন গণমাধ্যমের আর কোন স্বাধীনতা ও কোন সংস্কার নিয়ে আমরা কথা বলছি বলেও প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।

আলোচনায় আরও অংশ নিয়েছেন প্রথম আলোর উপসম্পাদক, এ কে এম জাকারিয়া, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও সাংবাদিক জিমি আমির, ইউল্যাব এর সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক সুমন রহমান, আইনজীবী নজরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও প্রধান শিবলী নোমান, সাবেক প্রেস সচিব ও দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. এস এম রেজওয়ান উল আলম।

ছবি: সুমন কান্তি পাল/দৃক










 








 
2026 ©Drik, Design & Developed by Decode Lab